শিশুদের সেরা ১০টি বই: ছোটদের জন্য যে বইগুলো পড়া উচিত
শিশুদের বই মানেই শুধু গল্প বা বিনোদন নয়। একটি ভালো বই শিশুর কল্পনাশক্তি বাড়াতে পারে, নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচয় করাতে পারে এবং নিজের মতো করে চিন্তা করার অভ্যাস তৈরি করতে পারে। তাই ছোটদের জন্য বই বাছাই করার সময় শুধু বইটি মজার কি না, সেটি দেখলেই হয় না। গল্পের ভাষা, কল্পনার জগৎ, চরিত্র, হাস্যরস এবং বয়স উপযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলা শিশু সাহিত্যে এমন অনেক বই আছে যেগুলো একাধিক প্রজন্ম ধরে পাঠকের কাছে পরিচিত। রূপকথা থেকে শুরু করে হাসির গল্প, ছড়া, অ্যাডভেঞ্চার, রহস্য এবং গোয়েন্দা গল্প, শিশুদের জন্য বইয়ের জগতটি বেশ বৈচিত্র্যময়।
এই তালিকায় তাই বিভিন্ন ধরনের পাঠকের কথা মাথায় রেখে শিশুদের সেরা ১০টি বই বাছাই করা হয়েছে।
শিশুদের বইগুলো হলো-
১. টুনটুনির বই – উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
টুনটুনির বই বাংলা শিশু সাহিত্যের অন্যতম পরিচিত বই। টুনটুনি, বাঘ, শিয়াল, হাতি, কাকসহ বিভিন্ন প্রাণীকে নিয়ে লেখা ছোট ছোট গল্পগুলো শিশুদের জন্য আনন্দদায়ক পাঠ তৈরি করে। বইটিতে ২৭টি শিশু-কিশোর গল্প থাকার কথা উল্লেখ আছে।

এই বইয়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো গল্প বলার সহজ ভঙ্গি। ছোটরা যেমন গল্পের মজা পাবে, তেমনি গল্পের চরিত্রগুলোর বুদ্ধি, বোকামি, সাহস ও কৌশল থেকেও নানা ধরনের শিক্ষা নিতে পারবে।
প্রাণী ও মজার চরিত্রের গল্প পছন্দ করে এমন শিশুদের জন্য এটি খুব ভালো একটি বই।
২. ঠাকুরমার ঝুলি – দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
বাংলা রূপকথার কথা উঠলে ঠাকুরমার ঝুলি আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয়। বইটিতে রাজা-রানি, রাজপুত্র-রাজকন্যা, দৈত্য, দানব এবং নানা কল্পজগতের চরিত্র নিয়ে রূপকথার গল্প রয়েছে।

শিশুর কল্পনাশক্তি বিকাশের ক্ষেত্রে এমন গল্পের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। বাস্তব জগতের বাইরে একটি কল্পনার জগৎ তৈরি করে গল্প পড়ার অভ্যাস ছোটদের বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে পারে।
যেসব শিশু রূপকথা ও রাজকন্যার গল্প পছন্দ করে, তাদের জন্য এটি চমৎকার শুরু।
৩. আবোল তাবোল – সুকুমার রায়
আবোল তাবোল শিশুদের ছড়ার জগতে একটি বিশেষ নাম। সুকুমার রায়ের কল্পনাপ্রবণ, মজার এবং শব্দের খেলায় ভরা ছড়াগুলো ছোটদের যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি বাংলা ভাষার সৌন্দর্যের সঙ্গেও পরিচিত করে।

এই বই পড়ার সময় শিশুরা অদ্ভুত সব চরিত্র, মজার পরিস্থিতি এবং ছন্দের সঙ্গে পরিচিত হয়। বিশেষ করে যারা গল্পের চেয়ে ছড়া ও শব্দের খেলা বেশি পছন্দ করে, তাদের জন্য আবোল তাবোল দারুণ একটি বই।
৪. হযবরল – সুকুমার রায়
হযবরল সুকুমার রায়ের আরেকটি অসাধারণ কল্পনাধর্মী লেখা। বইটির জগৎ বাস্তবতার নিয়মে চলে না। অদ্ভুত সব চরিত্র, অস্বাভাবিক পরিস্থিতি এবং হাস্যরসের মাধ্যমে লেখক শিশুদের সামনে এক ধরনের কল্পনার জগৎ তৈরি করেছেন।

শিশুরা সাধারণ গল্পের বাইরে একটু অদ্ভুত ও মজার কিছু পড়তে চাইলে এই বইটি তাদের ভালো লাগতে পারে। একই সঙ্গে বইটি শিশুর কল্পনাকে প্রচলিত গল্পের কাঠামোর বাইরে নিয়ে যায়।
৫. পাগলা দাশু – সুকুমার রায়
পাগলা দাশু সুকুমার রায়ের অন্যতম জনপ্রিয় শিশুতোষ চরিত্র। দাশুর অদ্ভুত বুদ্ধি, দুষ্টুমি এবং হাস্যকর কর্মকাণ্ডকে ঘিরে গল্পগুলো তৈরি হয়েছে।

বইটির বড় আকর্ষণ হলো হাস্যরস। তবে শুধু হাসানোর জন্য গল্পগুলো লেখা হয়নি। দাশুর আচরণ ও পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বুদ্ধি, পর্যবেক্ষণ এবং প্রচলিত ধারণাকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হয়।
যে শিশু মজার গল্প পছন্দ করে এবং দীর্ঘ উপন্যাসের চেয়ে ছোট গল্পে বেশি আগ্রহী, তার জন্য এটি ভালো পছন্দ।
৬. ক্ষীরের পুতুল – অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ক্ষীরের পুতুল বাংলা শিশু সাহিত্যের একটি পরিচিত কল্পকাহিনি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই রচনায় রূপকথার আবহ, রাজপরিবারের চরিত্র এবং কল্পনার নানা উপাদান রয়েছে।

রূপকথার গল্পের মতো হলেও বইটির ভাষা ও গল্প বলার ধরনে বাংলা শিশুসাহিত্যের নিজস্ব সৌন্দর্য রয়েছে। তাই শিশুকে বাংলা সাহিত্যের পুরোনো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ শিশুতোষ রচনার সঙ্গে পরিচয় করাতে চাইলে এটি ভালো একটি বই।
৭. চাঁদের পাহাড় – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
শিশুদের অ্যাডভেঞ্চার বইয়ের তালিকায় চাঁদের পাহাড় অবশ্যই রাখা যায়। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র শঙ্কর, যে নিজের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে আফ্রিকার অজানা জগতে অভিযানে যায়। বইটি ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী পাঠকদের রহস্য, গোয়েন্দা, থ্রিলার ও অ্যাডভেঞ্চার বিভাগের পাশাপাশি শিশু-কিশোর উপন্যাস হিসেবেও পরিচিত।

অজানা জায়গা, বিপদ, প্রকৃতি এবং অভিযানের প্রতি আগ্রহ তৈরি করার ক্ষেত্রে বইটির আলাদা শক্তি রয়েছে। একটু বড় শিশু বা কিশোরদের জন্য এটি বিশেষভাবে উপযোগী।
যে শিশু অ্যাডভেঞ্চার ও রোমাঞ্চকর গল্প পছন্দ করে, তার হাতে এই বই তুলে দেওয়া যেতে পারে।
৮. ফেলুদা সমগ্র – সত্যজিৎ রায়
শিশু বা কিশোরকে রহস্য ও গোয়েন্দা গল্পের সঙ্গে পরিচয় করাতে চাইলে ফেলুদা সিরিজ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। ফেলুদা, তোপসে এবং জটায়ুকে ঘিরে বিভিন্ন রহস্য ও অভিযান এই সিরিজের মূল আকর্ষণ।

ফেলুদার গল্পের বিশেষ দিক হলো শুধু রহস্য নয়, এর সঙ্গে পর্যবেক্ষণ, যুক্তি, তথ্য এবং অনুসন্ধানের বিষয়ও থাকে। ফলে গল্প পড়ার পাশাপাশি শিশুর চিন্তা করার আগ্রহও বাড়তে পারে।
৯. নন্টে ফন্টে সমগ্র – নারায়ণ দেবনাথ
কমিকস ও হাসির গল্প পছন্দ করা শিশুদের জন্য নন্টে ফন্টে দারুণ একটি সিরিজ। নন্টে, ফন্টে এবং তাদের চারপাশের চরিত্রগুলোকে ঘিরে তৈরি বিভিন্ন মজার ঘটনা বইটির মূল আকর্ষণ।

গল্পের পাশাপাশি ছবির উপস্থিতি শিশুদের পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যারা বড় আকারের লেখা পড়তে এখনও খুব বেশি আগ্রহী নয়, তাদের জন্য কমিকস একটি সহজ শুরু হতে পারে।
১০. কাকাবাবু সমগ্র – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় কিশোরদের জন্য কাকাবাবু সিরিজ বেশ আকর্ষণীয়। কাকাবাবু ও সন্তুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশ, অজানা জায়গা, রহস্য এবং অভিযানের গল্প এগিয়ে যায়।

কাকাবাবু সমগ্রের বিভিন্ন খণ্ড পাওয়া যায় এবং প্রথম খণ্ডে ভয়ংকর সুন্দর, সবুজ দ্বীপের রাজা, পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক, খালি জাহাজের রহস্য ও মিশর রহস্যসহ কয়েকটি কাহিনি রয়েছে।
যেসব কিশোর বইয়ের মধ্যে অ্যাডভেঞ্চার, ভ্রমণ ও রহস্য একসঙ্গে খুঁজে পায়, তাদের জন্য কাকাবাবু সিরিজ দীর্ঘদিন পড়ার মতো একটি জগৎ তৈরি করতে পারে।
বয়স অনুযায়ী শিশুদের বই বাছাই
৪ থেকে ৮ বছর
এই বয়সে রূপকথা, ছড়া ও ছোট গল্প দিয়ে শুরু করা ভালো।
ভালো অপশন:
- ঠাকুরমার ঝুলি
- টুনটুনির বই
- ক্ষীরের পুতুল
- আবোল তাবোল
৮ থেকে ১২ বছর
এই বয়সে হাসির গল্প, কল্পকাহিনি ও মজার চরিত্রের বই বেশ আকর্ষণীয় হতে পারে।
ভালো অপশন:
- পাগলা দাশু
- হযবরল
- নন্টে ফন্টে
- টুনটুনির বই
১২ বছর বা তার বেশি
এই বয়সে অ্যাডভেঞ্চার, রহস্য ও গোয়েন্দা গল্পের দিকে যাওয়া যায়।
ভালো অপশন:
- চাঁদের পাহাড়
- ফেলুদা
- কাকাবাবু
শেষ কথা
শিশুর জন্য সেরা বই বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে বয়সের পাশাপাশি তার আগ্রহটাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু রূপকথা ভালোবাসতে পারে, আবার কেউ রহস্য বা অ্যাডভেঞ্চার ছাড়া অন্য কিছু পড়তেই চাইতে পারে না।
তাই একসঙ্গে অনেক বই দেওয়ার পরিবর্তে শিশুর পছন্দের ধরন বুঝে বই নির্বাচন করা ভালো। টুনটুনির বই, ঠাকুরমার ঝুলি, আবোল তাবোল, পাগলা দাশু, চাঁদের পাহাড়, ফেলুদা কিংবা কাকাবাবু, প্রতিটি বইই শিশুদের জন্য আলাদা ধরনের পাঠের অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।

One Comment